| শিরোনাম |
❒ ঢাকা-রংপুরে প্রতিবাদ, স্বচ্ছ তদন্ত চান সবাই; কাকতালীয় নাকি আড়ালে অন্য কিছু—উত্তর খুঁজছে জনমত
❒ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘প্রকৃত আসামি’ গ্রেপ্তার করা না হলে শুক্রবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি
❒ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘প্রকৃত আসামি’ গ্রেপ্তার করা না হলে শুক্রবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা হিন্দু মহাজোটের ছবি:
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ড এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। একটি পরিবারের চারজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি অপরাধের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং নিরাপত্তা, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবেও সামনে এসেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে ঢাকা ও রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে আল্টিমেটাম দিয়েছে।
২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের একটি বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও, নিহত পরিবারের স্বজন ও বিভিন্ন মহল ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়ে আসছেন। নিহতদের স্বজনরা বলছেন দু’জন হ্যাংলা পাতলা যুবক একরাতে ইয়াবা সেবন ও ৪ জনকে খুন করতে পারে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কাকতলীয় নাকি ভিন্ন উদ্দেশ্যে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা হলো-নিহতরা হিন্দু ধর্মালম্বী। পুলিশ কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার এবং আটক দু’জন একই ধর্মের। এছাড়া আসামির গায়ে পুলিশের শার্ট, বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন-এসবই কী কাকতলীয় ? এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
ঘটনাটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। নিহত পরিবার, গ্রেপ্তার আসামি, তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে অনেকে আলোচনা করছেন। তবে তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় অপরাধের প্রমাণ নয়—প্রকৃত সত্য নির্ভর করবে আলামত, তদন্ত প্রতিবেদন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।
যেমন-নিহত ৪ জন হলেন, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওরফে ভোলা (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী। পুলিশ কর্মকর্তারা হলেন-সনাতন চক্রবর্তী ও পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি। গ্রেফতারকৃতরা হলেন-মামাতো-পিশতো ভাই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। লাশের ময়না তদন্তকারী ডাক্তার ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবলু কুমার বিশ্বাস। ডোম-যতন রায় (ধর্ষণের আলামত মিলেছে-ভিডিও ভাইরাল) আসামির গায়ে পুলিশের শার্ট। বিদ্যুৎ সংযোগ দিন-রাতভর কেন ? জনমনে এমনকি নিহতদের স্বজনরা বলছেন-দু’জন হ্যাংলা পাতলা তরুণ কী একরাতে ৪ জন মোটা তাজা লোককে হত্যা করতে পারে ? অন্যদিকে, ডোম যতন রায় বলছেন-বীর্য পাওয়া গেছে কিন্তু ডাক্তার স্যার বলতে নিষেধ করেছেন। বাইরে বলা যাবে না। ডোমের ভিডিওটি একাত্তর টিভিতে প্রকাশের পর সন্দেহ জোরালো হয়েছে।
সমাজ সচেতন মহল বলছেন, জনমনে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর উত্তর দেওয়া জরুরি। চারজন মানুষকে একসঙ্গে হত্যার মতো ঘটনায় তদন্তে শুধু অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; ঘটনার পূর্বাপর পরিস্থিতি, সম্ভাব্য সহযোগী, উদ্দেশ্য এবং সব ধরনের আলামত যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবাদকারীদের একটি অংশ বলছে, যদি গ্রেপ্তার ব্যক্তিরাই অপরাধী হয়, তবে তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ স্পষ্টভাবে সামনে আসতে হবে। আর যদি ঘটনার পেছনে অন্য কোনো যোগসূত্র থাকে, সেটিও প্রকাশ করতে হবে। অর্থাৎ মূল দাবি এখন একটাই—কোনো পক্ষের পরিচয় নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদ্ঘাটন।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটসহ বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ করেছে, ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন এবং কোনো বিষয় যেন আড়ালে না থাকে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন তদন্ত সংস্থার ওপর। কারণ একটি হত্যাকাণ্ডে দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়, বরং গ্রহণযোগ্য তদন্তই জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। কাকতালীয় কোনো বিষয়, নাকি কোনো তথ্য আড়ালে রয়েছে—তার উত্তর মিলবে কেবল নিরপেক্ষ অনুসন্ধানেই।
রংপুরের এই ঘটনা তাই এখন শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং মানুষের আস্থার বড় এক পরীক্ষা।