| শিরোনাম |
❒ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা-মন্দির ও প্রতিমা ভাংচুর ১২৭
❒ নির্যাতনের শিকার ১,৬২১ নারী ও কন্যাশিশু, হামলা-হয়রানির মুখে ৩৮৩ সাংবাদিক
❒ প্রতীকী ছবি:
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৫০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৬ জন। হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে ১৯টি মন্দির, ১৫টি প্রতিমা ও ৪৩টি বসতবাড়িতে। একই সময়ে জমি দখলের চারটি ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি গণপিটুনি ও মব-সহিংসতার ২৬১টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বুধবার প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
মূলধারার ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংস্থাটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মব-সহিংসতার ঘটনাগুলোর পেছনে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, বাকবিতণ্ডা ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ১৪১টি ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ১১৯ জন আহত হয়েছিলেন।
রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ছয় মাসে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জন নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত বা হামলার শিকার হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতের ৬ জন এবং আওয়ামী লীগের ৩ জন রয়েছেন। এছাড়া ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৬৭৩টিই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ঘটেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ছয় মাসে ৩৯৬টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ৬০০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ সময় রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনের নাম উল্লেখ এবং ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক। ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ বেশি। তাদের মধ্যে ৪০৪ জন ধর্ষণের শিকার, যার ২৩৮ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৮ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে। যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতায় ১৯ জন নিহত, ৮ জন আহত এবং তিনজন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩২০ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১৪৭ জন নারী।
শ্রমিকদের অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছয় মাসে শ্রমিক নির্যাতনের ৩৩১টি ঘটনায় ৭৪ জন নিহত ও ১ হাজার ৩ জন আহত হয়েছেন। কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২১৬ শ্রমিক। বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় ২৬ শ্রমিককে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে দুই গৃহকর্মী নিহত, চারজন আহত এবং আরও দুই গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। ছয় মাসে ৪০টি সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। এতে ৩১১ জন আহত ও ৩৮ জন আটক হয়েছেন। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় ৩০টি মামলায় ৮১ জনকে অভিযুক্ত এবং ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাংবাদিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে ছয় মাসে ২০০টি হামলার ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, লাঞ্ছিত হয়েছেন ৬০ জন, হুমকি পেয়েছেন ৪৯ জন এবং আটক হয়েছেন ১১ জন।
এছাড়া সীমান্তে বিএসএফের হামলায় ৯ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সহিংসতায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১১ জনের মৃত্যু এবং কারাগারে ৫৮ জন বন্দির মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব-সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী-শিশু নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মতো ঘটনাগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। সূত্রঃ মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির জানুয়ারি-জুনের প্রতিবেদন