| শিরোনাম |
❒ যশোরের মনিরামপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই বন্ধু নিহত
❒ প্রবাসী বাবা ফেরার পর রাকিবের লাশের দাফন
❒ নিহত রাকিব ও জনি ছবি:
মণিরামপুরের নাদড়া গ্রামের আকাশে যেন একসঙ্গে নিভে গেল দুটি সম্ভাবনাময় জীবনের আলো। পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যতের আশা আর মায়ের বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে পথচলা শুরু করা মেহেদী হাসান জনি আর রাকিব হোসেনের জীবন থেমে গেল একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়।
মেহেদী হাসান জনির জীবন ছিল সংগ্রামের গল্প। মণিরামপুর উপজেলার নাদড়া গ্রামের এই তরুণের বাবা কামরুজ্জামান ঢাকার মিরপুর এলাকায় প্রাইভেটকার চালিয়ে সংসার চালাতেন। ছোটবেলা থেকেই সংসারের বাস্তবতা বুঝে বড় হয়েছেন জনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি গ্রামে ইলেক্ট্রনিক্সের কাজ শিখেছিলেন, যাতে পরিবারের বোঝা কিছুটা হলেও কমাতে পারেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চলতি বছরের ১৭ মে মামা নূরুজ্জামানের প্রচেষ্টায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চেকিং সুপারভাইজার পদে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে ঈদুল আজহার ছুটিতে ২৫ মে গ্রামের বাড়িতে ফিরেছিলেন। পরিবারের সদস্যদের মুখে তখন ছিল নতুন স্বপ্নের হাসি।
সোমবার ছিল জনির নতুন কর্মস্থলে ফের যোগদানের দিন। কিন্তু সেই দিনটি আর দেখা হলো না তার।
রোববার সন্ধ্যায় বন্ধু রাকিব হোসেনকে নিয়ে মোটরসাইকেলে রাজগঞ্জ এলাকায় ঘুরতে বেরিয়েছিলেন জনি। সেখানে একটি কনসার্ট দেখে ফেরার পথে রাজগঞ্জ-পুলেরহাট সড়কের গালদা মানিকতলা মোড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে থাকা একটি আমড়া গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায় তাদের মোটরসাইকেল। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুই বন্ধু।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই নাদড়া এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস। আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো—জনি ও রাকিব দুজনেই ছিলেন তাদের বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান। এক নিমিষেই দুই পরিবার হারিয়েছে তাদের ভবিষ্যতের ভরসা।
রোববার গভীর রাতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে গ্রামের বাড়িতে আনা হয় জনির মরদেহ। সোমবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজার সময় আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের চোখে ছিল অশ্রু আর অপূর্ণ স্বপ্ন হারানোর বেদনা।
অন্যদিকে নিহত রাকিব হোসেনের মরদেহ এখনও পরিবারের অপেক্ষায়। তার বাবা ইসমাইল হোসেন মালয়েশিয়ায় কর্মরত। একমাত্র ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনি দ্রুত দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। বাবার বাড়িতে ফেরার পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রাকিবকে দাফন করা হবে।
রাকিবও ছিলেন সংগ্রামী এক তরুণ। যশোর শহরের একটি কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করতেন তিনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি যশোর জেনারেল হাসপাতালের সামনে একটি ওষুধের দোকানে কাজ শিখছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ধীরে ধীরে।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতদের বন্ধু রমিন ইসলাম জানান, রোববার সন্ধ্যায় তিনটি মোটরসাইকেলে আটজন বন্ধু মিলে রাজগঞ্জ এলাকায় একটি কনসার্ট দেখতে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে রাত ৯টার দিকে ফেরার সময় গালদা মানিকতলা মোড়ে একটি মোটরসাইকেলকে অতিক্রম করার চেষ্টা করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান রাকিব। মুহূর্তের মধ্যে মোটরসাইকেলটি রাস্তার পাশের আমড়া গাছে ধাক্কা খায়। গুরুতর আহত অবস্থায় দুজনকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
জনির মামা নূরুজ্জামান বলেন, “অনেক চেষ্টা করে বিমানবন্দরে চাকরির ব্যবস্থা করেছিলাম। মাত্র আট দিন কাজ করার পর ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছিল। আজ চাকরিতে ফেরার কথা ছিল। আরও তিন মাস পর চাকরিটা স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য মতিয়ার রহমান বলেন, “রাকিব ও জনি দুজনেই খুব ভালো ছেলে ছিল। তাদের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।”
যে বয়সে স্বপ্ন নিয়ে নতুন পথে হাঁটার কথা, সেই বয়সেই দুই তরুণের জীবন থেমে গেল নির্মম এক দুর্ঘটনায়। জনির বিমানবন্দরের চাকরি, রাকিবের উচ্চশিক্ষা আর পরিবারের জন্য কিছু করার স্বপ্ন—সবকিছুই এখন শুধুই স্মৃতি। নাদড়া গ্রামের মানুষ আজও বিশ্বাস করতে পারছেন না, একসঙ্গে হারিয়ে গেছে তাদের দুই প্রিয় সন্তানের মতো তরুণ।