| শিরোনাম |
❒ শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর তালিকায় দুই নম্বর ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি টিটন অধ্যায়ের অবসান
❒ ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালকে আসামি করে নিহতের বড়ভাই রিপনের মামলা
❒ সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত টিটনের ফাইল ছবি:
ঢাকার ব্যস্ততম এলাকায় গুলিতে নিহত তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইমুর হাসান টিটনকে যশোর কারবালায় দাফন করা হয়েছে। এরআগে বুধবার (২৯ এপ্রিল) ঢাকায় ময়না তদন্ত শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে তার লাশ নিয়ে নিহতের বড়ভাই রিপন গ্রামের বাড়ি যশোরের খড়কির উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাত ৮টার দিকে লাশবাহি অ্যাম্বুলেন্সটি খড়কির বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে জানাজা শেষে শহরের কারবালার বাড়িতে তার দাফন সম্পন্ন হয়। তার দাফনের মধ্যদিয়ে টিটন-টুটুল অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।
খড়কির বাড়িতে লাশ আসার পর স্থানীয়দের ভিড়
যশোরের খড়কি থেকে অপরাধ জগতে উত্থান
এদিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে তার অতীত, পারিবারিক পটভূমি এবং বিস্তৃত অপরাধ সাম্রাজ্য। টিটন-টুটুল যশোর সরকারি এমএম কলেজের ছাত্র ছিলেন জানিয়ে স্থানীয়রা জানিয়েছেন-তারা ভাল ফুটবল খেলতো। ফুটবলার হিসেবে বেশ খ্যাতি ছিল। বাবা ফখরুদ্দিন চাকরি করতেন খুলনার একটি জুটমিলে। তার দুই স্ত্রী ছিল। ৭ পুত্র ও ৫ কর্যার জনক ছিলেন তিনি। চাকরির সুবাদে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের নিয়ে খুলনাতেই বসবাস করতেন। তবে টিটন-টুটুল যশোর খড়কির আপনের মোড় এলাকার বাড়িতেই থাকতেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তাদের পারিবারিক বিরোধ ছিল কারাবাল এলাকার বিএনপি কর্মী খোকন ও টিপুর সাথে। একদিন টুটুল মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে বিএনপির দুই কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর তারা দুই সহোদর ঢাকায় পালিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, খুন-গুম, হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন নাইমুর হাসান টিটন। এরআগে ২০০০ সালে র্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে প্রাণ হারান টিটনের ছোটভাই জোড়া হত্যা মামলার আসামি টুটুল। ওই সময় তাদের বাবা ঢাকায় বদলী হন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঢাকাতে বসবাস শুরু করেন। এরমধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন টিটনের এক বোনকে জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে দুই পরিবারের মধ্যে আপস-রফা হয়। টিটন অপরাধ জগতের মুকুটহীন সম্রাট বনে যান।
যেভাবে টিটনকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশে টিটন দুর্বৃত্তের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়-এক মোটরসাইকেলে দু’জন আসে। পেছনের জন টিটনকে খুব কাছ থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়েল টিটন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে অস্ত্রধারী মোটরসাইকেল থেকে নেমে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করে টিটনের মৃত্যু নিশ্চিত করে। এসময় স্থানীয়রা দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করলে তারা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে টিটনকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্থানীয়রা। সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন টিটন। ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে, যেখানে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে।
যশোর কারবালায় দাফন
যশোরের খড়কি থেকে অপরাধ জগতে উত্থান
টিটনের পৈত্রিক বাড়ি যশোর শহরের খড়কি এলাকায়, স্থানীয়ভাবে ‘আপন মোড়’ নামে পরিচিত স্থানে। সাত ভাই ও পাঁচ বোনের বড় পরিবারে জন্ম নেওয়া টিটন অল্প বয়সেই অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। তার ভাই টুটুলও একই পথে হাঁটেন।
স্থানীয়দের দাবি, তাদের অপরাধজগতে প্রবেশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের, যিনি টিটনের ভগ্নিপতি।
খুন, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে টিটন ও টুটুল যশোরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তারা। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালা এলাকায় মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিএনপি কর্মী মোসলেম উদ্দিন খোকন ও টিপুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ঢাকায় বিস্তার অপরাধ ও প্রভাব
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দুই ভাই ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে বড় অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। টিটন ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হন। ২০২১ সালে প্রকাশিত ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় টিটনের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। একই তালিকায় তার ভগ্নিপতি ইমনের নামও ছিল।
টুটুলের মৃত্যু ও টিটনের একক আধিপত্য
২০০০ সালে র্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন টুটুল। এরপর টিটন ঢাকায় অবস্থান নিয়ে এককভাবে তার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। যদিও তিনি গোপনে কাজ করতেন, তবুও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট
স্থানীয়দের অভিযোগ, টিটন যশোর-ঢাকা রুটে একটি শক্তিশালী অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অস্ত্র এনে যশোর হয়ে ঢাকায় সরবরাহ করা হতো। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন
টিটনের বাবা ফখরুদ্দিন খুলনার একটি জুটমিলের কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবারে দুই মা, সাত ভাই ও পাঁচ বোন। বুধবার বড় ভাই রিপন তার লাশ ঢাকা থেকে বাড়িতে এনেছে। এশার নামাজের পর জানাজার নামাজ শেষে শহরের কারবার কবরস্থানে টিটনের মরদেহ দাফন করা হয়। স্থানীয়দের মতে, টিটন অবিবাহিত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় ছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং সংগঠিত অপরাধ চক্রের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পিচ্চি হেলালকে আসামি করে নিহতের বড়ভাই রিপনের মামলা
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শহীদ শাহনেওয়াজ হলের সামনে বটতলা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাইম আহমেদ টিটন নিহতের ঘটনায় অপরাধীদের নানা সূত্র ধরে তদন্ত করছে পুলিশ। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুরের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালকে প্রধান আসামি করে নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেছেন নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকালে নিউমার্কেট থানায় উপস্থিত হয়ে তিনি মামলাটি করেন।