রবিবার , ১৭ মে ২০২৬ , ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)
যশোরজুড়ে চড়ক পূজা তপস্যা শতবর্ষের ঐতিহ্য

❒ সময় যেন তখন ‘সন্ন্যাসীদের’, আর মানুষ তখন দর্শক—বিশ্বাস আর সাধনার এক বিস্ময়কর মিলনমেলা

প্রকাশ : সোমবার, ১৩ এপ্রিল , ২০২৬, ০৯:১১:০০ পিএম , আপডেট : বুধবার, ১৫ এপ্রিল , ২০২৬, ১০:১২:৫১ পিএম
সুনীল ঘোষ:
Shornolota_2026-04-15_69dfab598f531.jpg

❒ যশোরের চাঁচড়ার বর্মণপাড়া ও শুঁড়া গ্রামে চড়ক পূজায় মিলন মেলা ছবি:

চৈত্রের অন্তিম প্রহরে, যখন রৌদ্রের দহন মাটি আর মানুষের শরীর ছুঁয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করে, তখনই বাংলার আকাশে ভেসে ওঠে কাসর, ঘণ্টা আর মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি। সেই ধ্বনি শুধু একটি গ্রামের নয়—যশোরের চাঁচড়া বর্মণপাড়া থেকে অভয়নগর, কেশবপুর হয়ে সদরের ছাতিয়ানতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এক অনন্ত আধ্যাত্মিক আবহে। সময় যেন তখন ‘সন্ন্যাসীদের’, আর মানুষ তখন দর্শক—বিশ্বাস আর সাধনার এক বিস্ময়কর মিলনমেলার।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) যশোরের চাঁচড়া বর্মণপাড়ায় শত বছরের চেনা দৃশ্য আবারও জেগে ওঠে। ধুলো উড়ানো বিকেলের মধ্যে গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি আর আধ্যাত্মিকতার মিশেলে আয়োজিত চড়ক পূজা দেখতে ভিড় করেন শত শত মানুষ। এই প্রাচীন উৎসব তার স্বকীয়তা এখনো অম্লান রেখে বহন করে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের উত্তরাধিকার।

চড়ক পূজার সবচেয়ে রোমহর্ষক অধ্যায়টি যেন শুরু হয় নীরব এক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। কয়েকজন ‘সন্ন্যাসী’ কোনো প্রকার সুরক্ষা ছাড়াই ধারালো কাঁটাযুক্ত উঁচু খেজুর গাছে চড়ে বসেন। ভক্তদের চোখে এটি ‘শিবের অলৌকিক কৃপা’, কিন্তু গভীরভাবে দেখলে ধরা পড়ে—এ এক দীর্ঘ সাধনা, সংযম আর শরীরের ভারসাম্যের নিখুঁত শিল্প। মাসব্যাপী প্রস্তুতির পর পায়ের বিশেষ ভঙ্গি আর হাতের পরিমিত ব্যবহারে তারা জয় করেন কাঁটার ভয়। শীর্ষে পৌঁছে যখন অবলীলায় খেজুরের ছড়ি ছিঁড়ে নিচে ফেলেন, তখন তা হয়ে ওঠে সাহসিকতার এক জীবন্ত প্রতীক। বংশপরম্পরায় অর্জিত এই কৌশল আজও ধরে রেখেছেন বর্মণপাড়ার ‘সন্ন্যাসীরা’।

এই ধারাবাহিকতার কণ্ঠ হয়ে ‘সন্ন্যাসী’ ইন্দ্রজিৎ বর্মণ বলেন, ‘শত বছর ধরে চড়ক পূজা করে আসছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। তারই ধারাবাহিকতা আমরা বজায় রেখেছি। বিগত তিন দিন ধরে আমরা নানা উপাসনা করছি। আমরা বিশ্বাস করি, মহাদেব (শিব) এই পূজার মাধ্যমে খুশি হয়ে আমাদের মনের বাসনা পূরণ করবেন। আর আজ যে খেজুর ভাঙা হলো, সেই কাঁচা খেজুর দিয়েই আগামীকাল আমরা মহাদেবের পূজা করবো।’

তিনি আরও বলেন, “‘সন্ন্যাসীরা’ খালি গায়ে কাঁটাযুক্ত খেজুর গাছে উঠে খেজুর ভাঙবে। যদি কারও মনে অবিশ্বাস থেকে থাকে বা অন্য কোনোভাবে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তার শরীরে কাঁটা বিঁধে যাবে।” এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কৌশল জানা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

স্থানীয় বাসিন্দা বিধানচন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘এই পূজার মধ্য দিয়ে আমরা শিবের আরাধনা করি। এই পূজা থেকে আমরা অনেক উপকৃত হই। বিশেষ করে যারা দুস্থ আছেন, তারা এই পূজার মাধ্যমে মহাদেবের কাছে মনের আশা পূরণের আর্জি জানান। পাশাপাশি এই পূজার দিন থেকেই আমাদের মনে নববর্ষের একটা আমেজ চলে আসে। এই দিন থেকেই আমরা সবকিছু নতুন করে পাবো বলে বিশ্বাস করি।’ তিনি জানান, এলাকাটিতে প্রায় ছয় হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী বাসিন্দা রয়েছেন এবং প্রতি বছর মহোৎসবের মধ্য দিয়ে তারা এই দিনটি উদযাপন করেন।

একই আবহ ছড়িয়ে পড়ে যশোরের অন্যান্য জনপদেও। অভয়নগর, কেশবপুর ও সদরের ছাতিয়ানতলাজুড়ে পালিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা। রোববার (১২ এপ্রিল) সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলার শুঁড়া গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি বড় আয়োজন, যেখানে দিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘চড়ক ঘুল্লি’। এই ঘুল্লিকে কেন্দ্র করে শত শত দর্শনার্থীর ভিড় জমে, আর আকাশের দিকে ঘূর্ণায়মান সেই দৃশ্য যেন বিশ্বাসেরই প্রতীক হয়ে ওঠে।

জানা গেছে, প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে শুঁড়া গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখে এই পূজার আয়োজন করে আসছেন। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহজুড়ে দিনব্যাপী এই আয়োজন চলে, আর পূজাকে ঘিরে বসে গ্রামীণ মেলা—যেখানে মাটির গন্ধ, মানুষের হাসি আর উৎসবের রঙ একাকার হয়ে যায়।

যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পূণ্যার্থীরা অংশ নেন এই পূজায়। পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থীরাও সমান আগ্রহে উপভোগ করেন এই আয়োজন। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি—ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ মিলেছে এক অভিন্ন উৎসবে।

চড়ক ঘুল্লি দেখতে আসা ভক্তরা জানান, এই আয়োজন ধর্মীয় রীতির অংশ হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে লোকজ ঐতিহ্যের গভীর শিকড়। তবে সময়ের পরিবর্তনে আগের তুলনায় এই আয়োজন কিছুটা কমে এসেছে। তবুও সরাসরি এই দৃশ্য দেখতে পেরে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন।

এইভাবে চাঁচড়া বর্মণপাড়া থেকে শুঁড়া গ্রাম, অভয়নগর থেকে কেশবপুর—সমগ্র যশোরজুড়ে চড়ক পূজা হয়ে ওঠে এক অনন্য সেতুবন্ধন। এখানে আচার আছে, আছে কৌশল; আছে বিশ্বাস, আবার আছে বাস্তব সাধনা। আর সবকিছুর শেষে থেকে যায় একটাই উপলব্ধি—বিশ্বাস যখন অটল হয়, তখন মানুষই হয়ে ওঠে নিজের শক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ।

আরও খবর

Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
🔝