| শিরোনাম |
❒ বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয় জলাতঙ্কে
❒ অবহেলা, একটি গোপনীয়তা আর একটি ভ্যাকসিন না নেয়ায় ঝরে গেল ছেলেটির প্রাণ
❒ পরিবার ছাপিয়ে গ্রামেও শোকের ছায়া ছবি:
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার জয়নগর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে তিন মাস পর প্রাণ হারিয়েছে সাগর হোসেন (১৩) নামের এক কিশোর। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে যে মৃত্যু ঠেকানো যেত—এমনই বলছেন চিকিৎসকরা।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, প্রায় তিন মাস আগে গ্রামের পাশে মাঠে খেলতে গিয়ে একটি শিয়াল হঠাৎ সাগরকে হাচড়ে দেয়। ভয়ে কিংবা অবহেলায় বিষয়টি গোপন রাখে সে। কোনো চিকিৎসাও নেয়নি। গত সোমবার হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হলে তখনই পরিবারকে ঘটনা জানায়। তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, পরে খুলনায় রেফার করা হলেও চিকিৎসকরা ফেরত দেন। শেষ পর্যন্ত বুধবার ভোরে বাড়িতেই মারা যায় সাগর।
গ্রামে কান্নার রোল
সাগরের মৃত্যুতে গোটা গ্রামে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। প্রতিবেশী মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমরা কোনোদিন ভাবিনি শিয়ালের আঁচড়ে এভাবে মৃত্যু হতে পারে। ছেলেটা খুব ভালো ছিল। এখন বুঝতে পারছি সচেতন না হলে এরকম বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সালমা খাতুনের আক্ষেপ—“ভ্যাকসিন যদি সময়মতো দেওয়া হতো, সাগর হয়তো আজ বেঁচে থাকত। আমাদের গ্রামের অনেকেই এসবকে গুরুত্ব দেন না।”
চিকিৎসকের সতর্কবার্তা
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অনুপ কুমার বসু বলেন, “শিয়াল, কুকুর, বিড়াল বা যেকোনো বন্য প্রাণীর কামড়কে হালকাভাবে নিলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। জলাতঙ্কের কোনো চিকিৎসা নেই। তাই কামড় বা হাচড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান অন্তত ১৫ মিনিট সাবান ও পানি দিয়ে ধুতে হবে এবং অবিলম্বে হাসপাতালে গিয়ে র্যাবিস ভ্যাকসিন নিতে হবে।”
বাংলাদেশে জলাতঙ্কের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২০০-এর বেশি মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়। এর বেশিরভাগ মৃত্যু ঘটে গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে এখনও সচেতনতার ঘাটতি ও চিকিৎসা নেওয়ার অনীহা রয়েছে। অথচ এই রোগ শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য—শুধু সময়মতো টিকা নিলেই প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কুকুর নয়, শিয়ালসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামে গ্রামে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো এবং সহজলভ্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা ছাড়া এ ধরনের মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়।
সাগরের অকাল মৃত্যু তাই এখন পুরো জয়নগর গ্রামের কাছে এক করুণ শিক্ষা—একটি অবহেলা, একটি গোপনীয়তা, আর একটি ভ্যাকসিন না নেওয়ার কারণে হারিয়ে গেল তেরো বছরের একটি প্রাণ।